এক্সক্লুসিভ: ভুয়ো চাহিদার কথা প্রচার করে ফের বাজার ধরতে চাইছে চীনা স্মার্টফোন কোম্পানিগুলি?

chinese-smartphone-companies-are-trying-to-recapture-the-market-by-promoting-fake-demand

Xiaomi, Vivo ইত্যাদি চীনা ব্র্যান্ডের নতুন স্মার্টফোন কিংবা গ্যাজেটের কথা বললেই এখন একাংশ নেটিজেনদের কটূক্তি ধেয়ে আসে আমাদের দিকে। প্রতিদিনই নিত্যনতুন যুক্তি দেখিয়ে মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় চীনা দ্রব্য বয়কট করার দাবি করে চলেছেন। এদিকে শাওমির মত জনপ্রিয় কোম্পানিগুলির কথা বিশ্বাস করলে চীনা স্মার্টফোন বিক্রি তে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং বিক্রি আরও বেড়েছে। প্রতিবারই কোনো ফ্ল্যাশ সেল শেষ হওয়া মাত্র সংস্থারা দাবি করছে তাদের প্রোডাক্টের চাহিদা তুঙ্গে, স্বল্প সময়ের এই সেলে তারা গ্রাহকদের থেকে নাকি অভাবনীয় সাড়া পাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে চীনের ওপর ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও এত ফোন কারা কিনছে? সোশ্যাল মিডিয়াতে তবে কারা, যারা বয়কট চীনা হ্যাশট্যাগ দিচ্ছেন? নাকি সমস্তটাই সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক কৌশল? আজ আমি এই বিষিয়ে কিছু ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

আমরা আবেগ থেকে বা আশঙ্কা থেকে যতই চীনা ফোন বর্জন করার কথা বলিনা কেনো, একথা মানতেই হবে চীনা ফোনগুলি ছাড়া আপাতত কম দামের মধ্যে অধিক ফিচার এবং উন্নত পারফরম্যান্স কোনো বিকল্প ব্র্যান্ড অফার করতে পারছেনা। আর সেকারণেই অ্যামাজন বা ফ্লিপকার্ট সাইট থেকে ফ্ল্যাশ সেলে শাওমির মত চীনা সংস্থার কোনো ফোন কেনা বেশ দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু এতটাও কি চাহিদা আছে যে, পাঁচ মাস আগে লঞ্চ হওয়া কোনো ফোনের সেল শুরু হওয়ার ৫ সেকেন্ডের মধ্যেই ফোনটি আউট অফ স্টক হয়ে যাচ্ছে?

এর আগে মনে করা হচ্ছিল করোনা প্যান্ডেমিকের জেরে ভারতের বাজারে স্মার্টফোনের স্টক একেবারে সীমিত। এছাড়া ভারতে কাস্টম ক্লিয়ারেন্স নিয়ে সমস্যায় পড়ছে চীনা ব্র্যান্ডগুলি, যার জন্য বাজারে ফোনের স্টকও বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু এদিকে ধীরে ধীরে যত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, তত দ্রুত যেন ফোন আউট অফ স্টক হচ্ছে। নিজের সাথে ঘটা কয়কেটি ঘটনা আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, আমি আগেও বেশ কয়েকটি রেডমি ফোন ফ্ল্যাশ সেলে কিনেছি। প্রথম সেলে সুযোগ না পেলেও সেই ফোনগুলি দ্বিতীয় সেলে কিনতে পারেনি এমন আগে কখনো হয়নি। তবে এবার গত একমাসের বেশি আমি ও আমরা বন্ধুরা মিলে শত চেষ্টা করেও রেডমির নতুন ফোন কিনতে পারছিনা।

আপনারা প্রায় সবাই জানেন গত মার্চ মাসে শাওমি ভারতে Redmi Note 9 Pro এবং Redmi Note 9 Pro Max ফোনদুটি লঞ্চ করেছিল। ব্যক্তিগত ভাবে বললে গত একমাস ধরে এই ফোনদুটির মধ্যে যেকোনো একটি কেনার জন্য আমি ত্রুটি রাখিনি। এই জুলাই মাসে দুটি ফোনের ৭দিন অন্তর মোট ৪টি সেল হয়েছে Amazon ও Mi.com এ। কিন্তু সেল শুরু হওয়ার তাৎক্ষণিক মুহূর্তে কখনো “Buy Now” অপশনের জায়গায় “Error” দেখতে পাওয়া গেছে, কখনো সঙ্গে সঙ্গে “Join Wishlist” বা “Wishlist Full” দেখতে পাওয়া গেছে। অথচ কিছুক্ষন পরে ফোনের ডিটেইলসে দেখানো হচ্ছে “In Stock”, অর্থাৎ ফোনগুলি স্টকে রয়েছে। যদিও আপনি সেইসময় ফোনটি কিনতে গেলে ‘আপনার এলাকায় ডেলিভারি সম্ভব নয় বা আমাদের থেকে কোনো সমস্যা হচ্ছে’ বলে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই ঘটনার কিছুক্ষন পরেই সংস্থা গর্বের সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের ফোনের চাহিদার কথা তুলে ধরছে।

এবার আসা যাক Poco M2 Pro ফোনটির কথায়। এই ফোনটি Redmi Note 9 Pro-এর Rebranded ভার্সন, মানে গোদা বাংলায় বললে যমজ। এই ফোনটির ফ্লিপকার্টে প্রথম সেল হয় গত ১৪ই জুলাই। এরপর ২৯ জুলাই আবার এই ফোনটির ফ্ল্যাশ সেল হয়। প্রত্যেক জায়গায় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বলা হয় ১৩,৯৯৯ টাকা মূল্যের ৪ জিবি ভ্যারিয়েন্ট থেকে সেল শুরু, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় সেল শুরু হতে দেখা যায় ৪ জিবি ভ্যারিয়েন্টটি “Coming Soon” অবস্থাতেই রয়েছে। চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই বাকি ভ্যারিয়েন্টগুলিও “Out of Stock” হয়ে যায়। একইভাবে পোকোর তরফে বলা হয় তারা অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছেন সেলে।

একথা সত্যি চীনা স্মার্টফোনের চাহিদা ভারতে বিরাট। কিন্তু করোনার কারণে মে মাসে সেল শুরু হওয়া (রেডমি নোট ৯ প্রো লঞ্চ হয়েছিল মার্চ মাসে ) একটি ফোনের এতটাও কি চাহিদা কমেনি যে, জুলাই মাসের শেষে এসেও সে ফোনটি পলক ফেলতে না ফেলতে আউট অফ স্টক হয়ে যায়? এরআগেও বহু রেডমি ফোন বাজারে এসেছে, কই সেগুলি কে তো ১০-১৫ টা ফ্ল্যাশ সেলের পর ওপেন সেলেই বিক্রি করা হত। কিন্তু ভারতীয়রা যেই চীনা প্রোডাক্ট বর্জনের ডাক দিল সাথে সাথেই এই ফোনগুলির চাহিদা বেড়ে গেল? শুধু রেডমি নয়, এই একই পদ্ধতি অবলম্বন করেছে অন্যান্য চীনা ব্র্যান্ডগুলিও।

ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি রিপোর্টে আপনিও হয়তো পড়ে থাকবেন যে, চীনা স্মার্টফোনের বিক্রি ভারতে অনেক কমেছে। এমনকি চীনা কোম্পানিগুলির মার্কেট শেয়ার ৮২ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৭৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে। অথচ কোম্পানিগুলি এমনভাবে প্রচার করছে যেন বিক্রি তো কমেইনি বরং আরও বেড়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিগুলি ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ লোগো লাগিয়ে ‘বেশি ভারতীয়’ (মানু কুমার জৈন বলেছিলেন) ব্র্যান্ড সাজায় কোনো ত্রুটি রাখছেনা। এমন নয় তো, যে যেহেতু ভারতীয়রা এই চীনা ব্র্যান্ডগুলিকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে, তাই এই ব্র্যান্ডগুলি ভুয়ো ডিমান্ড দেখানোর চেষ্টা করছে? যাতে আপনি ভাবেন সবাই কিনছে আমি কেন কিনবো না? বাজারে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে এবং অত্যন্ত চাহিদার কথা বলে ক্রেতা আকর্ষণ করতে চাইছে না তো সংস্থাগুলি? পুরোটাই কি ব্যবসায়িক চাতুর্য? আপনারা কী মনে করেন?

লেখাটি লিখেছেন অন্বেষা নন্দী (সহায়তা করেছে জুলাই মণ্ডল), এটি সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব মতামত। টেকগাপ এবিষয়ে খতিয়ে দেখেনি